পর্বতের মূষিক প্রসব from AponPost's blog

একটি বাগধারা। আমরা মোটামুটি সবাই পড়েছি। এর অর্থ একটু পরে বলি, বাগধারাটির একটি জন্ম ইতিহাস আছে। একটি গল্পও বলা যেতে পারে।

হিমালয়ের পাদদেশে বাস করতেন এক মুনিঋষি। এই নির্জন পর্বতে জনমানবহীন স্থানে তিনি সাধনা করতেন। পাশেই কুলকুল করে বয়ে চলেছে শীতল নদী। একদিন এই নদীর ঠান্ডা পানিতে পড়ে এক ইঁদুরের অবস্থা কাহিল হয়ে যায়। অনেক কষ্টে তীরে উঠেও, এটি শীতে কাঁপতে থাকে। ঋষি ইঁদুরটিকে দেখতে পায়, ইঁদুরটির জন্য তাঁর হৃদয় কেঁপে উঠে। তিনি এটিকে সেবা শুশ্রূষা করে একসময় সুস্থ করে তুলেন। দৈবশক্তির প্রভাবে ঋষিমশাই ইঁদুরটিকে একটি সুন্দর মেয়ের রূপ দান করেন এবং নিজের কন্যা সন্তানের মতই তাকে বড় করতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে মেয়েটি বড় হতে থাকে। একসময় সে বিয়ের উপযুক্ত হয়ে উঠে। ঋষির একমাত্র অবলম্বন; তাই খুব ধুমধাম করে তিনি মেয়েটিকে বিয়ে দিতে চান। মেয়েটির কাছে গিয়ে তিনি জানতে চাইলেন, "মা, তোমার কেমন বর পছন্দ"?

উত্তরে মেয়ে বলে, " পিতা, আমার বর হতে হবে এমন একজন; যিনি হবেন এই বসুধার সবচেয়ে শক্তিশালী"।

ঋষিমশাই চিন্তায় পড়ে গেলেন। চিন্তা করে দেখলেন যে, পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী হচ্ছে সূর্য। সূর্যদেবের কাছে গিয়ে মেয়ের ইচ্ছার কথা বললেন। তাঁর কন্যাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু, সূর্যদেব বেঁকে বসলেন, বললেন, 

"আমি তো সর্বাপেক্ষা শক্তিমান নই। আমার চেয়ে শক্তিধর পৃথিবীতে আছে। আর, তা হলো 'মেঘ'। এটি মাঝে মাঝে আমাকে ঢেকে দেয়!"

সব শুনে মুনি মেঘের কাছে গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। মেঘও চিন্তা করে বলল, "আমার চেয়েও শক্তিশালী হল 'পবন'। সে আমাকে ভেসে নিয়ে যায়। তখন বলতে গেলে আমার কিছুই করার থাকেনা। "

এবার ঋষিমশাই পবনের কাছে গিয়ে সব খুলে বললেন। পবন প্রথমে একটু খুশি হলেন। তারপর গম্ভীর হয়ে বললেন, "আমারও সীমাবদ্ধতা আছে, সব জায়গায় চাইলেই আমি যেতে পারিনা। এই হিমালয়ের উপর দিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এই হিমালয় আমার চেয়ে অনেক শক্তিশালী। "

মুনি এবার গেলেন হিমালয়ের কাছে। বিশাল হিমালয়ের কাছে গিয়েও তিনি মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। সূর্য, মেঘ, পবন এর মত হিমালয়ও একই উত্তর দিল। হিমালয় ঋষিকে বলল, "দেখতে বিশাল হলেও আমিই সর্বক্ষমতাধর নই। আমার চেয়েও ক্ষমতাধর পৃথিবীতে আছে। আর এটি হল 'ইঁদুর'। এই ইঁদুর আমার গায়ের ভিতর দিয়েও ফুটো করে দেয়! "

সবশেষে ইঁদুরের সাথেই ঋষি কন্যার বিয়ে সম্পাদন হয়। "পর্বতের মূষিক প্রসব", এখানে মূষিক শব্দের অর্থ হল ইঁদুর। আর বাগধারাটির অর্থ হলো "বিপুল উদ্যোগে তুচ্ছ অর্জন "।

এক সময় সরকার খুব ঘটাও করে "কমিউনিকেটিভ ইংলিশ " চালু করেছিলেন। নতুন ধরণের এই ইংরেজী চালুর কারণে ছাত্র-ছাত্রীরা ইংরেজী পড়া প্রায়ই বন্ধই করে দিয়েছিল। আগে মোটামুটি যে একটু আধটুক গ্র্যামার পড়তো সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। ইন্টারে ইংলিশ ফার্স্ট পেপার বইটি আমি কয়বার উল্টিয়েছি, তাও হয়তো এখন হিসেব করে বলতে পারব।

এরপর আরও ঘটাও করে চালু হল, সৃজনশীল পদ্ধতি। সৃজনশীল পদ্ধতিটা কিন্তু খারাপ না। কিন্তুু, একটি নতুন পদ্ধতি চালু করতে, শিক্ষা ক্ষেত্রে যে কাঠামোগত সংস্কার দরকার তা সরকার তৈরি করতে পারেনি। তাছাড়া, নিয়মিত প্রশ্নফাঁস তো আছেই। আজকে যেই প্রতিবেদনটা দেখে আমরা সবাই হাসছি, তার জন্য সম্পূর্ণভাবে সরকার দায়ী। প্রশ্নবানে জর্জরিত সেই শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই দায়ী নয়। সরকার শুধু বিভিন্ন সময় বিশাল বিশাল উদ্যোগ নিয়ে, কিছু সিস্টেম চালুই করেন। কিন্তু, এর ফলাফলের দিকে তাঁদের একফোটা নজর নেই। অর্জনটা তাই মূষিকের মত তুচ্ছই হয়ে আছে।


Share:
Previous post     
     Next post
     Blog home

The Wall

No comments
You need to sign in to comment

Post

By AponPost
Added Jul 1 '16

Tags

Rate

Your rate:
Total: (0 rates)

Archives