User blogs

Tag search results for: "ছোট গল্প"
AponPost

আমার মা-জননীরা দুই বোন। জননী ছোট। আমার একমাত্র খালার একমাত্র মেয়ের বিয়ে। যেই সময়ের কথা বলছি তখন আমি ক্লাস থ্রিতে কিংবা বড়জোর ফোরে পড়ি। বিয়ের একদিন আগে বিকেলেই আমরা খালার বাড়ি পৌঁছে যাই। খালার বাড়িটি ছিল একটি আদর্শ বাড়ি। বিশাল ভিটে, সামনে উঠোন, পিছনে পুকুর। পুকুরের পাড় জুড়ে নানারকম ফলমূলের গাছ। উঠোনের সামনেই হালদা নদী। শৈশবে তাই খালার বাড়িতে যাওয়া মানেই আনন্দ। গাছে গাছে চড়া, নদীতে মাছ ধরা, আর এটা ওটা খাওয়া।

যেহেতু বোনের বিয়ে, সেহেতু আনন্দের মাত্রাটা একটু বেশিই। বাড়ী জুড়ে প্রচুর মানুষ, গমগম করছে পুরো বাড়ি, আর একগাদা খেলার সাথী। বিকেলটা ভালই গেল। কিন্তু, যখন রাত হয়ে আসে তখন খেলার সাথীরা একে একে নিজেদের ঘরে চলে যায়। আমার বয়সের কাউকে আর দেখিনা। মন মরা হয়ে উঠোনে একটি লম্বা টুলে বসে আছি। কিছুক্ষণ পরে আমার এইজের ই এক মেয়ে তার ছোট একটা ভাইকে নিয়ে পাশে এসে বসে। এভাবেই পরিচয়। নাম-ধাম বলেছিল কিনা মনে নেই, তবে মেয়েটি আমার ক্লাসের ছিল; এইটুকু মনে আছে। রাত ৯টার দিকে আমাদের খেতে দেওয়া হয়, আমরা একসাথেই খাই। বড়রা সবাই নিজেদের কাজে ব্যস্ত, কারণ পরদিন দুপুরেই বিয়ে। আমি, মেয়েটি আর তার ভাই একটি খাটের উপর বসে আছি। হঠাৎ, মেয়েটি বলে উঠে, "চলো, আমরা একটা খেলা করি।" আমি রাজি হওয়াতেই সে খাটের মশারী টাঙ্গানো শুরু করে দিল। মশারী গুজে টুজে আমাকেও ভিতরে ঢুকতে বলল। আমি আর তার ভাই ঢুকলাম। মেয়েটি এবার আমার কানের কাছে এসে নীচু গলায় বলল, "আমরা জামাই-বউ, কাউকে বলিও না, কেমন! " :-P

আমি সাদাসিধে মানুষ কিছু না বুঝে সম্মতি দিলাম। এরপরে, সে তার বউগিরি শুরু করে দিল। বাজার আনো, মাছ আনো, লবন আনো, মরিচ আনো...। প্রথমে সবকিছু ঠিকঠাক মতই চলছিল। আমি অফিসে যাচ্ছি, বাজার আনছি, সে চা করে দিচ্ছে। একসময় সে আরও ঘনিষ্ট হয়ে কানের কাছে এসে জানালো, তাঁর ছোট ভাইটা আমাদের ছেলে। ভাইটাকে আমার একদম পছন্দ না। খালি টেঁ টেঁ করে। তার উপর ডাব্বো মাথা (ন্যাড়া)। তবু মেনে নিলাম। :-(

এরপর আরও কিছুক্ষণ এভাবে গেল। হঠাৎ, কি যে হলো, দু'জনের মধ্যে ঝগড়া লেগে গেল। ঝগড়া তো নয়, একেবারে মারামারি। একসময় মারামারিটা থুথু ছুঁড়াছুঁড়িতে চলে গেল। ঘুমানোর আগ অবধি সেই ঝগড়া অব্যাহত ছিল। পরে, আমার খালাতো বোন দু'জনকে দু'পাশে রেখে মাঝখানে এসে শুইলেন।

বিয়ের পরে আমরা ঘরে চলে আসি। মেয়েটির সাথেও আর দেখা হয়নি। মেঘে মেঘে বেলা চলে যায়। হালদা নদীও এর মধ্যে প্রশস্ত হয়েছে। নদীর ভাঙ্গনে খালাদের সেই ভিটে বাড়ির কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমিও দ্রুত বড় হয়ে উঠি। পরে খালার বাড়িতে যতবার বেড়াতে গেছি, মেয়েটিকে খুঁজেছি, পাই নি। নাম জানিনা, কিছু জানি না, পাবোই বা কিভাবে?

সেইদিনের বিয়ের সেই ঘটনা এখন চিন্তা করলে একটা ব্যাপার বুঝতে পারি। মেয়েরা অনেক গুছালো, স্বপ্নময়ী। নয়তো এই ক্ষুদ্র মশারীর ভিতরেও কিভাবে এমন রঙ্গিন স্বপ্ন বুনতে পারে.!

আজ আমার জীবনের প্রথম বন্ধু মঞ্জুর পবিত্র আক্দ অনুষ্টান। তাঁর দাম্পত্য জীবন সুখময় হোক। গত বেশ কয়েকবছর ধরে একের পর এক বন্ধুরা বিয়ে করছে। তারা হানিমুনে যায়, শপিংয়ে যায়, হ্যাংআউটে যায়, আর সেল্ফি খিঁচায়। ফেসবুকে তাদের বেয়ে বেয়ে পড়া ভালবাসা দেখে আমারও বুকের ভিতর থেকে একটা অস্ফুট ধ্বনি বের হয়ে আসে যে, "আমারও একটা বউ ছিল!!! "

-

পবন চৌধুরী