বিসিএস লিখিত প্রস্তুতি: সাহিত্য সমালোচনা

সাহিত্য সমালোচনা – (মার্কস -১৫) লেখার কৌশল

এই ১৫ মার্কসের জন্য অামরা অনেকেই অনেক সময় নষ্ট করি। তাই নতুনদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করছি যাতে ১৫ মার্কসের জন্য ১৫ মার্কসের বেশী সময় নষ্ট না করে ফেলি। সাহিত্য সমালোচনায় এখনও সুনির্দিষ্ট কোন লেখক/সাহিত্য-এর নাম ধরে অাসেনি। অাশা করা যায় ৩৭ এও পূর্বের ধারা অব্যাহত থাকবে। তাই একদিন সময় করে ১৫-২০ টা বই এর নিম্নোক্ত পয়েন্ট অনুসারে নোট করে ফেললেই কেল্লাফতে–
• বই-এর নাম।
• লেখকের নাম
• লেখকের যৌক্তিক প্রশংসা
• লেখার প্রক্ষাপট
• গল্প/কবিতা/নাটক/উপন্যাস/ইতিহাস বিষয়ক বই এর মূলভাব।
• পজিটিভ সমালোচনা
• দু-এক বাক্যে পুরো বিষয়ের অালোকপাত করে ফিনিশিং
উদাহরণস্বরূপ—-
সাহিত্য সমালোচনা
মহাশ্মশান
কবি : কাজেম আল কোরায়েশী (কায়কোবাদ)
মহাকবি কায়কোবাদ (১৮৫৮-১৯৫২) প্রকৃত নাম কাজেম আলকোরেশী বাঙালী মুসলমান সাহিত্যিকদের সাহিত্য সাধনার ইতাহাসে নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী নাম। মহাকবি কায়কোবাদ যে যুগে জন্মগ্রহণ করেছেন তার পূর্বেই ঊনিশ শতকের বাঙালী জাতীয়তাবাদ বা নবজাগরনের সূচনা হয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর জাতীয়তাবোধে অনুপ্রানিত হয়ে কায়কোবাদ জাতীয় উদ্দীপনামূলক কাব্য রচনা করেছেন |পূণর্জাগরনবাদী হিন্দু লেখকেরা সে সময় ভারতবর্ষ বলতে মুসলিমবর্জিত ভারতবর্ষকে বুঝত তার স্পষ্ট ছাপ তাঁদের লেখায় দেখতে পাওয়া যায়। অন্যদিকে পুনর্জাগরনী মুসলমানদের চেতনায়ও তেমনি এ দেশের চেয়ে আরব, ইরান ছিল নিকট আত্মীয়। সমসাময়িক অন্যান্য কবিদের সাম্প্রদায়িক মনোভাবের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ না করে তিনি অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবোধকে প্রশ্রয় দেন | বলা যায় মহাকবি কায়কোবাদ তার এরূপ মনোবৃত্তির প্রতিফলন ঘটানোর জন্য ররচনা করেন মহাশ্মশান। কাব্যটি তিন খন্ডে বিভক্ত। প্রথম খন্ডে ঊনত্রিশ সর্গ,দ্বিতীয় খন্ডে চব্বিশ সর্গ,এবং তৃতীয় খন্ডে সাত সর্গ। মোট ষাট সর্গে প্রায় নয়শ’ পৃষ্ঠার এই কাব্য বাংলা ১৩৩১, ইংরেজি ১৯০৪ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় ।
‘মহাশ্মশান’ এককথায় ঐতিহাসিক প্রণয় কাহিনী বা ঐতিহাসিক ট্রাজেডির রূপ পেয়েছে। মানুষের দেহাশ্রিত কামনা বাসনার যে ব্যাপক ও গভীর অভিব্যক্তি সমসাময়িক কালের কথাসাহিত্যে পাওয়া যায় কবির শিল্পী মন নিজের অজ্ঞাতেই তা স্বীকার করে নিয়েছে । এই কাব্যে বীরবৃন্দ পানিপথ যুদ্ধের মহা আয়োজনে ব্যাপৃত । দেশের জন্য ধর্মের জন্য, স্বজাতীর জন্য তাদের উৎকন্ঠার শেষ নেই । আসন্ন সংঘাতের ভাবনা তাদের বিচলিত করেছে, তবে সবচেয়ে বড় দূর্ঘটনা ঘটেছে তাদের হৃদয়ে ।
উত্তর পশ্চিম ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের পানিপাত জেলার একটি শহর পানিপথ।এখানে ভারত মহাদেশের ইতিহাসে পানিপথের যুদ্ধ হিসেবে খ্যাত তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যু্দ্ধ সংগঠিত হয়। প্রথম যুদ্ধ 1526 সালে, দ্বিতীয় যুদ্ধ 1556 সালে,তৃতীয় যুদ্ধ 1761 সােল সংঘটিত হয় | 1761 সালে অাহমদ শাহ অাবদালীর মারাঠা ও শিখদের পরাজিত করে এই যুদ্ধে এবং ভারতে মারাঠা শাষিত রাজ্যের পতন ঘটানো হয়। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মহারাষ্ট্রীয়দের পরাজয় এবং আহমদ শাহ আবদালীর বিজয় বর্ণনাই মূলত ‘মহাশ্মশান’ মহাকাব্যের বিষয়বস্তু।
ভারতে হিন্দু রাজ্য পুনঃস্থাপনের সংকল্পে মারাঠারা অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কাবুল অধিপতি আহমদ শাহ আবদালীর সহায়তায় রোহিলার অধিপতি নজীবদ্দৌলা ভারতের মুসলিম শক্তির সংগঠন করেন। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মুসলমানরা জয় লাভ করলেও উভয় জাতীর জীবনে করুন ও মর্মান্তিক পরিনতি নেমে আসে। মহাকবি কায়কোবাদ এই ভয়াবহ সংগ্রামের মাধ্যমে মানবভাগ্যের উত্থানপতনের বিস্ময়কর রহস্য অনুধাবন করেছিলেন। তাঁর মতে,
”একপক্ষে পানিপথ যেমন হিন্দু গৌরবের সমাধিক্ষেত্র,
অপরপক্ষে মুসলমান গৌরবেরও মহাশ্মশান।”
*কাব্যের মূল ঘটনা, এবং প্রধান প্রধান পুরুষ চরিত্র ইতিহাস অবলম্বনেই চিত্রিত। ইব্রাহিম কার্দি, আতা খাঁ,আদিনা বেগ,সদাশিব, ঐতিহাসিক ব্যাক্তি । সুজাউদ্দৌলা,নজীবউদ্দৌলা,আহমদ শাহ আবদালী প্রমুখ ঐতিহাসিক চরিত্র । যুদ্ধের মূল ঘটনার সঙ্গে সংযুক্ত প্রেমকাহিনী ও অন্যান্য পার্শ্ব চরিত্রই শুধু কবি-কল্পিত । ইতিহাস এবং কল্পনার অসাধারন যুগলবন্দী এই কাব্যে ঘটলেও কোথাও ইতিহাসকে বিকৃত করেন নি তিনি। অথবা কোথাও ঐতিহাসিক চরিত্রকে এতটুকু হীন করেও দেখান নি ।
*ইব্রাহীমের পরিনতি এবং জোহরা বেগম প্রসঙ্গ কবি কল্পনা প্রসূত। হিরনবালা -আতা খাঁর কাহিনীর প্রায় সবটাই কবি কল্পিত। লবঙ্গ-রত্নজীর কাহিনী পুরোটাই কবি কল্পনার অংশ।
*বিশ্বনাথ-কৌমুদী কাহিনীর বিশ্বনাথ ও ইতিহাসের বিশ্বাস-রাও একই ব্যাক্তি। ঘটনাগত দিক থেকে দেখা যায় দত্তজীর ছিন্ন মুন্ড আবদালীকে উপহার দেয়ার ঘটনাটি ঐতিহাসিকভাবে সিদ্ধ তবে দত্তজীর শিরচ্ছেদকারীর নাম মিয়া কুতুব শাহ।
*মারাঠা এবং দুরানী উভয় পক্ষেরই সুজাউদ্দৌলার সহায়তা কামনা, নজীব কর্তৃক আসন্ন যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধের আখ্যা দেয়া এবং শেষে সুজার মুসলিম শক্তির পক্ষে যোগদান,এসবই ইতিহাসে আছে।
*সুজার মাধ্যমে বিশ্বাসের মৃতদেহ সৎকার করার জন্য পাঠানো ঐতিহাসিক, নজীবউদ্দৌলা,আহমদ শাহ আবদালী ও সদাশিবের বীরত্ব এসব ও ঐতিহাসিকভাবে সত্য।
কাব্য রচনার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তাঁর নিজের মতামত’মহাশ্মশান’গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন-
”আমি বহুদিন যাবত মনে মনে এই আশাটি পোষন করিতেছিলাম যে, ভারতীয় মুসলমানদের শৌর্য-বীর্য সংবলিত এমন একটি যুদ্ধকাব্য লিখিয়া যাইব, যাহা পাঠ করিয়া বঙ্গীয় মুসলমানগন স্পর্ধা করিয়া বলিতে পারেন যে একসময়ে ভারতীয় মুসলমানগনও অদ্বিতীয় মহাবীর ছিলেন; শৌর্যে বীর্যে ও গৌরবে কোন অংশেই তাহারা জাতের অন্য কোন জাতী অপেক্ষা হীনবীর্য বা নিকৃষ্ট ছিলেন না |
সমালোচকগণ মনে করেন, স্বজাতীয় তথা মুসলিমজাতীয়তাবাদের এই সামাণ্য অভিব্যক্তি বিয়োজন করলে অসমাম্প্রদায়িক কীর্তির মহানিদর্শন তারকার মত জ্বলজ্বল করে দ্যূতি ছড়ায় বহুদূর ব্যাপ্তি |
পরিশেষে বলা যায়, ইতিহাসকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠা এই’মহাশ্মশান’ কবি কায়কোবাদের অসামান্য সৃষ্টি। যা দক্ষ্য কারিগরের সুনিপুণ তুলির নিখুঁত আছড়ে একটি সার্বভৌম ভূখন্ডে বসবাসরত বৃহত্তর জাতীয়তাবাদের অন্তর্দ্বন্দের কারণে উদ্ভুত অশুভ পরিণামকে দেখিয়ে দিয়েছে ।

by >> কৃষিবিদ কাওছার হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published.